পেপটিক আলসার ও দুধ: ভুল ধারণা বনাম পুষ্টিবিজ্ঞানের সঠিক তথ্য
আপনার কি পেপটিক আলসার আছে? তাহলে হয়তো অনেকেই আপনাকে পরামর্শ দিয়েছেন দুধ পান না করার জন্য। ইন্টারনেটে বা আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে শুনে অনেক রোগীই আতঙ্কিত হয়ে দুধের মতো একটি পুষ্টিকর খাবার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে আজ আমি আপনাদের এই প্রচলিত ভুল ধারণা এবং পুষ্টিবিজ্ঞানের সঠিক দিকটি পরিষ্কার করতে চাই।
কেন দুধ পেপটিক আলসারের জন্য আদর্শ?
পুষ্টি ও ডায়েটেটিক্স (Nutrition and Dietetics)-এর মানসম্মত রেফারেন্স বইগুলোতে পেপটিক আলসারের প্রতিটি স্টেজে দুধকে একটি আদর্শ খাবার হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণগুলো হলো:
১. প্রাকৃতিক বাফার: দুধের প্রোটিন পাকস্থলীর অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের (HCl) সাথে মিশে সেটিকে প্রশমিত করতে বা বাফার করতে সাহায্য করে। এতে আলসারজনিত জ্বালাপোড়া ও ব্যথা দ্রুত কমে।
২. টিস্যু মেরামত: আলসারের কারণে পাকস্থলীর ভেতরের মিউকোসাল স্তর ক্ষয়ে যায়। দুধের উচ্চমানের প্রোটিন (ক্যাসেইন ও হুই) ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনর্গঠন ও ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।
৩. পুষ্টির জোগান: দীর্ঘদিন আলসারের সমস্যায় ভুগলে শরীরে বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব দেখা দেয়। দুধ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের চমৎকার উৎস, যা শরীরকে দুর্বলতা থেকে রক্ষা করে।
এত ভুল ধারণা কেন?
অনেকে মনে করেন দুধ খেলে আলসার বেড়ে যায়। এর কারণ হলো 'রিবাউন্ড অ্যাসিড সিক্রেশন'। কেউ কেউ খালি পেটে অনেক বেশি পরিমাণে ঠান্ডা দুধ পান করলে পাকস্থলীর কোষগুলো উদ্দীপিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে সাময়িকভাবে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি দুধে নয়, বরং খাওয়ার পদ্ধতিতে।
রোগীদের জন্য আমার পেশাদার পরামর্শ ও সতর্কতা: দুধ একেবারে বাদ না দিয়ে বরং বরং খাওয়ার নিয়ম ঠিক করুন:
অল্প অল্প করে পান করুন: একবারে এক গ্লাস ভর্তি দুধ না খেয়ে, সারাদিনে ২-৩ বার সামান্য পরিমাণে (১৫০-২০০ মিলি) কুসুম গরম দুধ পান করুন।
খালি পেট এড়িয়ে চলুন: দুধ খাওয়ার সেরা সময় হলো অন্য কোনো খাবারের সাথে বা ভরা পেটে। এটি অ্যাসিডের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
ব্যক্তিগত সহনশীলতা: যদি দুধ খাওয়ার পর আপনার পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি হয় (যা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের কারণে হতে পারে), তবে দুধের বদলে টাটকা টক দই বেছে নিন। টক দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক আলসারের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া (H. Pylori) দমনে অত্যন্ত কার্যকর।
চিকিৎসকের পরামর্শ: মনে রাখবেন, দুধ আলসারের একটি চমৎকার সহায়ক খাবার মাত্র, এটি প্রধান চিকিৎসা নয়। তাই চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
উপসংহার:
পুষ্টিবিজ্ঞান কোনো খাদ্যকে নিষিদ্ধ করতে শেখায় না, বরং সঠিক খাদ্য নির্বাচন ও খাওয়ার শৈলী শেখায়। পেপটিক আলসার মানেই ডায়েট থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া নয়। বরং সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে রোগমুক্ত জীবন গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।
আপনার আলসারের ডায়েট চার্ট নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকলে বা ব্যক্তিগত পরামর্শের প্রয়োজন হলে আজই
পুষ্টিবিদ আকতারুল এর পুষ্টিবার্তা পেজে ইনবক্স করুন এবং এপয়েন্টমেন্ট নিন।
আপনার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হোন, সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করুন।

No comments